নির্মল সমীরণে আমাদের একদিন
চঞ্চল মাহমুদ ফুলর
মানবজাতির জন্য নির্মল সমীরণ যে কী প্রয়োজন, তা উপলব্দি করা যায় না? যদি না কেউ ইট-পাথরের বাইরে প্রান্তিক জনপদ ঘুরে না আসে, যেখানে রয়েছে প্রকৃতির অকৃপণ হস্তে বিন্যস্ত বাগান। কি নেই সেখানে? শৈল থেকে নীর। বৃক্ষরাজী থেকে তৃণমূল। মস্তকের উপরে কোন ভবনের ছাদ নয়, রয়েছে অসীম গগন। পদতলে সুধামাখা মৃৎ আর জলরাশির অকূল সমাহার। আহ! কী যে আনন্দ। আমার মুখে রা’ সরছে না। ভাষাহীন বিষ্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছি কিয়ৎক্ষণের জন্য। কিভাবে যে উপমা দেবো, তা আর আমার অভিধানে খোঁজে পাচ্ছি না। স্রষ্টা কী মহান! কত সুনিপূন হাতে গড়ে দিয়েছেন এ বসুন্ধরা!
এতোক্ষণ যা নিয়ে হ্যা-পিত্যেশ করছিলাম, তা আর কিছু নয়। বলছিলাম সিলেট অঞ্চলের অফুরন্ত জলাধার, মৎস্য আর জলজ প্রাণীর জলখেলির অরণ্য, সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরের কথা। যেখানে গেলে ভ্রমণপিপাসুদের আঁখির পাতা নড়তে চায় না।
গত ৪ জুন ’২৬, বৃহস্পতিবার। আমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪১ জন গিয়ে দেখে এসেছি সেই ঐতিহাসিক পর্যটন অঞ্চল টাঙ্গুয়ার হাওর ও সংলগ্ন এলাকা। আমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী বলতে সিলেট সদর দক্ষিণ তথা দক্ষিণ সুরমার ঐতিহ্যবাহী, বর্তমানে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ২৯নং ওয়ার্ডের লাউয়াই মহল্লার সু-প্রাচীন দালানবাড়ির বাসিন্দারা। যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিশ্বপর্যটক ও বিদেশী মুদ্রা সংগ্রাহক, বর্ষীয়ান শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী আলহাজ্ব বুরহান উদ্দিন আহমদ। ছিলেন পুলিশের সাবেক এসপি, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বর্ষীয়ান সমাজসেবী আলহাজ্ব এএসএম মাহবুবুল লতিফ, যাকে আমরা বাড়িতে ‘খোকন ভাই’ নামে ডাকি। ভ্রমণপিয়াসী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী, সাবেক ছাত্রনেতা, বিশিষ্ট সমাজসেবী শাহ আবুল মুনির ওরফে মানিক, লাউয়াই স্পোর্টিং ক্লাবের সাবেক সভাপতি, সাবেক কৃতী ফুটবলার, বর্তমানে লাউয়াই কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সহকারী মোতওয়াল্লী আলহাজ্ব মোঃ ইউনুছ মিয়া খসরু, ২ টার্মে দীর্ঘ ১৬ বছর যুক্তরাজ্যে কাটিয়ে শুধুমাত্র মা-মাটির টানে যিনি দেশে এসে স্থিত হয়েছেন, যার সারাদিনের ব্যস্ত সময় কাটে শুধু শাক-সবজি আর লতাপাতা নিয়ে, আমাদের সেই নিজাম উদ্দিন আহমদ, একটানা দীর্ঘ ৩৫ বছর মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতের একটি কোম্পানিতে যিনি কাজ করেছেন, সিলেট জেলা ফুটবল একাদশের এক সময়ের অপরিহার্য কৃতী খেলোয়াড় রিজ্জাদ আহমদ, লাউয়াই স্পোর্টিং ক্লাবের সাবেক কৃতী ফুটবলার, দীর্ঘ ১২ বছর যুক্তরাজ্যে কাটিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন, নির্ভেজাল চরিত্রের অধিকারী শাহিন আহমেদ, লাউয়াই স্পোর্টিং ক্লাবের সাবেক কৃতী ফুটবলার, যিনি খুব ভালো ব্যাডমিন্টন খেলতেন, যুক্তরাজ্য বিএনপি’র নবগঠিত আহবায়ক কমিটির অন্যতম সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক, শাহ স্পোর্টিং ক্লাব-লাউয়াই’র সভাপতি, বিশিষ্ট সমাজসেবী আলহাজ্ব শাহ মোঃ আখতার হোসেন টুটুল, আত্মপ্রচারে বিমুখ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী, লাউয়াই কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য আলহাজ্ব মোঃ আবুল মনসুর, দীর্ঘ প্রায় ৩২ বছর মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে কাটিয়ে এসেছেন, নিবৃত্তচারী ব্যক্তিত্ব মোঃ মুহিবুর রহমান শাইয়ুক, সিলেটের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র কালিঘাটের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী, বিশিষ্ট সমাজসেবী, যিনি নিরবে মানুষকে সহযোগিতা করে থাকেন, সেই মহিয়ান ব্যক্তিত্ব শাহ শাহীন আহমেদ, দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে কাটিয়ে দেশে ফিরে আসা আরেক নিভৃতচারী বেলাল আহমদ, তরুণ সমাজসেবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বাছিত আহমদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী, শাহ স্পোর্টিং ক্লাব-লাউয়াই’র নির্বাহী সদস্য জাকির হোসেন বাচ্চু, জাতীয় পর্যায়ের ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়, শাহ স্পোর্টিং ক্লাব-লাউয়াই’র ক্রীড়া সম্পাদক জুয়েল আহমদ, লাউয়াই স্পোর্টিং ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক, তরুণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী ইসমাইল আব্দুল্লাহ শিহাব, লাউয়াই স্পোর্টিং ক্লাবের প্রচার সম্পাদক, তরুণ ক্রীড়া সংগঠক হাসান উদ্দিন, শাহ স্পোর্টিং ক্লাব-লাউয়াই’র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, আরেক তরুণ ক্রীড়া সংগঠক শাহ শাফায়েত আহমদ, মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী, তরুণ ক্রীড়া সংগঠক ও সমাজকর্মী রাজন আহমদ, মালেক আহমদ ও তানভীর আহমদ, যুক্তরাজ্য প্রবাসী তরুণ ক্রীড়াবিদ শাহ ইকরাম হোসেন, তারুণ্যের প্রতীক ও কিশোর ক্রীড়াবিদদের মধ্যে রাজু আহমেদ, অপু আহমেদ, নাইম আহমেদ, ফাহিম আহমেদ, তাওহীদ আহমদ, শফী আহমদ, হাফেজ সারওয়ার আহমদ, মিজান আহমদ, সায়েম আহমদ, আইদি আহমেদ, মারজান আহমদ, রুবেল আহমদ, আরিফ আহমেদ, কিশোর সমাজকর্মী আমার প্রিয় নাতি মুসা আহমেদ ও ভাতিজা মাহিন আহমেদ। জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর বাইরে আরো দু’জন অভ্যাগত ছিলেন আমাদের ভ্রমণযাত্রায়। পুরো ভ্রমণযাত্রাকে মডারেট করেন লাউয়াই স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি, বর্তমানে কানাডা প্রবাসী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা ও সমাজসেবী গোলাম হাদী ছয়ফুল, পবিত্র ঈদ-উল আযহা উপলক্ষে প্রতিবছর যিনি দেশমাতৃকার টানে ছুঁটে আসেন, প্রবাস তাঁকে কোনভাবেও বেঁধে রাখতে পারে না, সেই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী, সাবেক ক্রীড়াবিদ, সকলের প্রিয় শরীফ উদ্দিন আহমদ এবং লাউয়াই স্পোর্টিং ক্লাবের কার্যকরী সভাপতি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী, ক্রীড়া সংগঠক, ২৯নং ওয়ার্ডের আগামীর কান্ডারি, রোটারিয়ান রাসেল মাহবুব পিএইচএফ, এমসি।
২০২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আমি কিছুদিন হাসপাতালে শয্যাশায়ী ছিলাম। এরপর থেকে চিকিৎসকের কড়া নির্দেশে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাপিত হচ্ছে জীবন। এরমধ্যেও গোষ্ঠীগত জরুরী প্রয়োজনে গত ১ জানুয়ারি একবার শ্রীলংকায় যেতে হয়েছিল। সম্ভবতঃ দিন দশেক অবস্থান করে চলে আসি। শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে খুব বেশি ঘুরাঘুরি করিনি। ভারত মহাসাগরের পাড়ে ঘন্টা কয়েক অতিক্রান্ত করেছিলাম।
এরপর দীর্ঘ পরিসরে আর কোথায়ও পা বাড়াইনি। স্নেহাস্পদ ভাতিজা গোলাম হাদী ছয়ফুল যখন বললো, চাচা মোটামুটি গোষ্ঠীর সিনিয়র সবাই যাচ্ছেন, আপনাকেও যেতে হবে। গেলে আপনার মনটাও তাজা হবে। অন্ততঃ গোটা একটা দিনের জন্য হলেও মনটা প্রফুল্ল থাকবে।’
বলপ্রয়োগ নয়, হার্দিক আবদারকে ‘না’ বলতে পারি নি। যাত্রাসঙ্গী হয়েছিলাম তাঁদের। আসলেই গোষ্ঠীর সকলকে একসাথে দেখে মনটা আপ্লুত হয়েছিল। নিবৃত্তে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। হয়তো আগামীতে এঁদের কারো সাথে আর এভাবে আনন্দচিত্তে যাওয়া নাও হতে পারে। হয়তো আমিও তাদের আর কোন আনন্দঘন অনুষ্ঠানে নাও থাকতে পারি। তাই মনটা সত্যিই প্রফুল্ল ছিল। কিন্তু পুরোনো অভ্যাসের কারণে ভোরের আগে যেহেতু নিদ্রাদেবীর ক্রোড়ে আশ্রয় নিতে পারি না, সে কারণে ওই রাতে অনিদ্রা থাকায় শারীরিকভাবে কিছুটা ব্যতয় ঘটছিল। কিন্তু কাউকে বুঝতে দেইনি। শেষ পর্যন্ত হাউস বোট বা বজরায় গিয়ে আর পারিনি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হয়েছে। আর দুপুরের খাবার খেয়ে ঘন্টাখানেক ঘুমানোর পর স্বাভাবিক হয়ে যাই।
যাক, এবার আসি ভ্রমণের কথায়। আমার স্নেহাস্পদ ভাতিজারা যারা আমাদের দালানবাড়ির আগামীর সুযোগ্য পরিচালক, আধুনিক চিন্তা-চেতনার ধারক, গোষ্ঠীর প্রতি অকৃত্রিম আন্তরিক, তারা অত্যন্ত সুচারুরূপে আমাদের ভ্রমণযাত্রাকে সাজিয়েছিল, যা বলে শেষ করা যাবে না। তাদের ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চাইনা। তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনা ছিল সুনিপূন। পানাহার থেকে শুরু করে যাত্রাবধি সব ছিল একেবারে সময়ের সাথে স্থিতি রেখে।
হাউস বোট বা বজরা’র কর্মীরাও ছিল খুবই পরিশ্রমী। তাদের আন্তরিকতা আমাদেরকে বিমুগ্ধ করেছে। তবে একটা বজরা ভর্তি শহুরে মানুষকে সেবা দিতে গিয়ে তাদের কিছুটা হলেও হিমসিম খেতে হয়েছে। আর এটাই স্বাভাবিক। ৭/৮ জন বজরা কর্মী আমাদের ৪৪ জনের টিমকে টাইম টু টাইমে সেবা প্রদান সহজ কথা নয়? তারপরও তারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, আমাদের সন্তুষ্ট রাখতে। আমি তাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
মজার ব্যাপার হলো, আমাদের দালানবাড়ির বর্তমান সময়ে বয়সের দিক থেকে যিনি দ্বিতীয় (প্রথম সিনিয়র যুক্তরাজ্য প্রবাসী আলহাজ্ব আব্দুল আহাদ ভাই), যিনি ইতোমধ্যে বিশ্বের ৮২টি দেশ ভ্রমণ করেছেন, সেই আলহাজ্ব বুরহান উদ্দিন আহমদ, সম্ভবতঃ বয়সে চতুর্থ (তৃতীয় আমাদের হাজী শাহার মিয়া চাচা) সাবেক পুলিশ সুপার আলহাজ্ব এএসএম মাহবুবুল লতিফ খোকন ভাই আমাদের সফরসঙ্গী হয়ে ভ্রমণযাত্রাকে উজ্জীবিত করেছেন। সাথে ছিলেন আরেক সিনিয়র মানিক চাচা, যিনি কাগজে-পত্রে শাহ আবুল মনির নামে পরিচিত। তাঁদের দেখে আমরা আরো উৎসাহ বোধ করি। ভ্রমণযাত্রার রাহাকষ্টটা আর তেমনটা উপলব্দি হয়নি।
যাত্রা শুরু বঙ্গবীর রোড অর্থাৎ লাউয়াই মহল্লার সামনে থেকে। তখন ভোর ৬টা। কিন্তু নির্ধারিত বাহন সময়মতো অকূস্থলে পৌঁছেনি। এদিকে আবার টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছিল। সবাই এদিক-সেদিক বন্ধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ছটা থেকে নিজেদের রক্ষায় ব্যস্ত ছিলেন। বাহনের দায়িত্বে থাকা গোলাম হাদী ছয়ফুল ভাতিজা বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। যাক, নির্ধারিত রথ এসে উপস্থিত হলে আমরা তাতে উঠে নিজ নিজ আসন নেই। ভ্রমণযাত্রা শুরু হয় সকাল সোয়া ৭টায়। সিলেটের দক্ষিণ সুরমা, সদর, বিশ্বনাথ, সুনামগঞ্জের ছাতক, শান্তিগঞ্জ, সদর, বিশ্বম্বরপুর, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর উপজেলাসমুহ পেরিয়ে তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ারপুর নামক স্থানে পৌঁছুলাম সকাল সাড়ে ১০টার দিকে। এখানেই আমাদের যাত্রার সড়কপথের ইতি টানা হলো। শুরু হলো নৌ-ভ্রমণ। হাউস বোট বা বজরায় উঠে সবাই খুবই উচ্চসিত। কয়েক মিনিটের মধ্যে বজরা রওয়ানা করে। রওয়ানার সাথে সাথেই বজরা কর্মীরা আমাদের সকালের নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করে। ভুনা খিঁচুড়ি, ভাজি করা সেদ্ধ ডিম, গোল বেগুন ভাজি সাথে সালাদ। পরে দুধ চা। সবাই আনন্দচিত্তে আপ্যায়িত হলেন।
বেলা সোয়া ১টার দিকে পৌঁছুলাম নিলাদ্রি লেক নামক স্থানে। একেবারে ভারতের সীমানা ঘেঁষে। মাত্র ২/৩ শ’ গজ দূরে ভারতের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়। পাহাড়ের কোল ছুঁয়ে বাংলাদেশের নিলাদ্রি লেক পরিভ্রমণ করে কেউ কেউ সংলগ্ন বাজারগুলোতে ঢুঁ মারতে গেলেন।
রিজ্জাদ চাচা, মনসুর ভাতিজা, শাহীন ভাতিজা, ছোট ভাই টুটুল, ভাতিজা বেলালসহ আমি নিলাদ্রি লেকের পাড় ঘেঁষে গেলাম নিকটবর্তী জয়বাংলা বাজারে। পাশেই রয়েছে বাংলাদেশের বড়ছড়া কাস্টম স্টেশন। কাস্টম স্টেশনের বিপরীতে ভারতের টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প। অনেকে আবার বাংলাদেশের জয়বাংলা বাজারকে টেকেরঘাট বাজার নামেও ডাকেন। কেউ কেউ বলেন শুধু বাংলাবাজার।
বাজারে ঢুকে একটি মিষ্টির দোকান থেকে খাঁটি দুধের ছানার মিষ্টি খেলাম। আমাদের শাহিন চাচা বজরার সবার জন্য ২ কেজি মিষ্টি নিয়ে এলেন। বাজারের মসজিদে সবাই জোহরের নামাজ আদায় করলেন। বাজার ঘুরে দেখা শেষে পুনরায় ফিরে এলাম নিলাদ্রি লেক এলাকায়। এসে দেখি লেক সংলগ্ন উঁচু একটি টিলার উপর সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হলাম। শুরু হলো সিনিয়রদের জন্য এক জাতীয় নতুন ফুটবল খেলা। আর জুনিয়দের জন্য মুরগের লড়াই। অনেক হাসি-খুশী আর আনন্দ হলো। খেলা শেষ হলো। সবাই একসাথে চলে এলাম বজরায়। বজরা ছেড়ে দিল। কিছু দূর যাওয়ার পর শুরু হলো টাঙ্গুয়ার হাওরে সাঁতার প্রতিযোগিতা। তাও এক সময় শেষ হলো। শুরু হলো দুপুরের খাবার বিতরণ। রুই মাছের ঝোল, বাচা মাছ ভাজি, আলু ভর্তা, সবজি, ডাল এবং সালাদ দিয়ে সবাই তৃপ্তি সহকারে দুপুরের ভোজন সারলেন।
আমার দিনের ও রাতের ওষুধ সাথে ছিল। খাবার পর ওষুধ সেবন করে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়ে পড়ি। সেই ফাঁকে আমি ছাড়া সবাই আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার বিতরণ করলেন। অত্যন্ত উপভোগ্য অনুষ্ঠানটি মিস করলাম, শুধুমাত্র শারীরিক অসুস্থতার জন্য। ৪/৫ থেকে বার আমাকে ডাকা হয়েছে অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য। কিন্তু শারীরিক সক্ষমতা না থাকায় যাওয়া হলো না। এরমধ্যে বজরা ফিরতি পথে রওয়ানা হয়ে গেছে। এবার কিন্তু আনোয়ারপুর এসে নৌ-ভ্রমণ শেষ নয়। নির্ধারিত বাস চলে গেছে সকালে আমাদের নামিয়ে দিয়েই। বজরা আমাদের নিয়ে যাবে সুনামগঞ্জ জেলা সদরে। আবার সেই আগের মতো তাহিরপুর, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা হয়ে সুনামগঞ্জ জেলা সদরের ওয়াইজখালী নামক ঘাটে পৌঁছুলাম। তখন ঘড়িতে রাত সাড়ে ১১টার কাঁটা পেরিয়ে গেছে। তবে কাজের কাজ যেটি হয়েছে, রাত সাড়ে ৯টার দিকে বজরার কর্মীরা আমাদের রাতের খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করিয়েছে। রাতের খাবারের মেন্যু ছিল রাজহাঁসের মাংশ, সবজি, ডাল ও সালাদ। অত্যন্ত সুস্বাদু হয়েছে। রাতের খাবারের পর সবারই শরীর একটু ঢিলে হয়ে গিয়েছিল আয়েশের কাছে। অল্প সময়ের জন্য হলেও রাতের খাওয়া শেষে সবাই একটু বিশ্রাম নিয়েছিলেন।
ওয়াইজখালিতে নামার পর ৩/৪ মিনিট হেঁটে আমরা বাস টার্মিনাল এলাকায় পৌঁছুলাম। ভোরের মতো নিলাদ্রি এক্সপ্রেসের অপর একটি ডিলাক্স/এসি বাস আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। সবাই উঠে গেলে ১২টা বাজার ২/১ মিনিট আগে বাস রওয়ানা হলো সিলেটের উদ্দেশ্যে। অত্যন্ত দক্ষ চালক, রাস্তাও প্রায় জনশূণ্য। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আমাদের গন্তব্যে চলে এলাম। ঘড়ির কাঁটায় রাত তখন প্রায় দেড়টা। মুরব্বিদের ফোরস্ট্রোকে তুলে দিয়ে আমরা সবাই হেঁটে হেঁটে বাড়িতে পৌঁছুলাম। যখন শয্যার আশ্রয় নেই, তখন রাত প্রায় সোয়া ২টা।
তবে শেষ কথা হলো, যে কোন ভ্রমণযাত্রাই কিছুটা হলেও কষ্টের হয়। সেদিনও আমাদের ভ্রমণযাত্রা অম্লমধুর ছিল। কিন্তু প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য আর নির্মল সমীরণ অবগাহন করে আমরা সবাই খুব তৃপ্তি পেয়েছিলাম। রাতের ঘুমটাও হয়েছে সেই রকম গভীর। সকালে উঠে শরীর একেবারে ঝরঝরে।
এই ভালো লাগার জন্য যারা এতো পরিশ্রম করেছে, তাদের জন্য দোয়া করি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আল-আমীন যেনো তাদের আগামীর দিনগুলো সমুজ্জ্বল করে তুলেন। আমীন
Leave a Reply