চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর দৌরাত্মে তটস্থ প্রতিবেশীরা
ইছবর-আকবর চক্র দাপট দেখিয়ে কেড়ে নিচ্ছেন স্বজনদের বাড়ি-জমি
শুভ্র শ্মশ্রুমন্ডিত লোকটিকে দেখতে মনে হবে তিনি বিরাট বড় পরহেজগার। দেখলে মনে হবে ওই ভদ্রলোক হয়তো খুব আল্লাহ্ওয়ালা। এভাবে ‘ভেক-ভাক’ ধরার মূখ্য উদ্দেশ্য লোকজনকে ধোঁকা দেয়া। কিন্তু বাস্তবে তিনি একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। তিনি শুধু মাদক ব্যবসায়ী-ই নন। নিজেও নিয়মিত মাদক সেবন করেন আর এলাকার উঠতি তরুণ-যুবকদের মধ্যে মাদকের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
এখানেই শেষ নয়। এর পাশাপাশি তিনি একজন দাপুটে জবরদখলদারও বটে। তার দৌরাত্মে এলাকার লোকজন, পাড়া-প্রতিবেশী আর আত্মীয়-স্বজনরা অতীষ্ঠ। একের পর এক মামলার মাধ্যমে ভয়-ভীতি দেখিয়ে দখল করে নিচ্ছেন প্রতিবেশীদের পৈতৃক ও খরিদা সম্পত্তি। অথচ তার বিরুদ্ধে কেউ একটি সাধারণ ডায়েরি করলেও ওই ব্যক্তির আর উপায় নেই। নানাভাবে তাদের হয়রাণী আর নাজেহাল করা হয়ে থাকে। এমনকি সন্ত্রাসী লেলিয়ে মারপিট করতেও দ্বিধা করা হয় না। তিনি সালিশ বিচারের ধার ধারেন না। এলাকার কারো কথা বা অনুরোধকে পাত্তা দেন না। তিনি নিজেকে এলাকার বিরাট দাপুটে লোক হিসেবে মনে করেন।
বলছিলাম, সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সিলাম ইউনিয়নের নিজ সিলাম গ্রামের বাসিন্দা ইছবর আলীর কথা। মৃত সুবেদর আলীর ছেলে ইছবর আলী বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে ওদের একনিষ্ট সহযোগী ছিলেন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনের পর নির্বাচিত চেয়ারম্যানকে নিজ উদ্যোগে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। সে সময় তার দাপটে এলাকায় কেউ তার বিরুদ্ধে টু-শব্দটিও করতে পারতো না। কোন না কোনভাবে ম্যানেজ করে তার সেই দাপটকে এখনও জিইয়ে রেখেছেন। বিশেষ করে নিরীহ স্বজনদের বিরুদ্ধে তো তিনি এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। সহযোগী হিসেবে রয়েছেন সহোদর আকবর আলীও।
আপন চাচাতো ছোট বোন-ভাইকে মামলায় জর্জরিত আর প্রাণনাশসহ নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে, হুমকী-ধমকি দিয়ে কেড়ে নিচ্ছেন ওদের মৌরশী সম্পত্তি। এতিম চাচাতো বোন বিলকিস বেগমের স্বামী একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটাচলা করেন। বিলকিছ বেগম একই বাড়ির মৃত তজব আলীর বড় মেয়ে। গত ১৩ মে পিতা ও চাচার কাছ থেকে বাড়ির ভেতরে মাত্র ২ শতক ভূমি কিনে ঘর তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। এ কারণে বিলকিসের উপর নেমে এসেছে ইছবর-আকবর চক্রের সর্বনাশা খড়গ। মাদকাসক্ত ইছবর আলী তার ভাই আকবর আলী এবং কিছু ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে সম্প্রতিপ্রসুতি বিলকিছ বেগমের উপর হামলে পড়ে। বিলকিছের চুলের মুঠি ধরে তাকে বেপরোয়া কিল-ঘুষি এবং পেঠের তলায় লাথি মেরে তাকে মাটিতে ফেলে দেয়া হয়। আহত বিলকিছ প্রচন্ড ব্যথায় মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকে। আহত বোন বিলকিছের শোর-চিৎকার শুনে ছোট ভাই মিম্বর আলী বোনকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে ইছবর বাহিনী তাকেও প্রচন্ড মারপিট করে। পরে এলাকার লোকজন দৌঁড়ে এসে ইছবর বাহিনীর কবল থেকে বিলকিছ ও মিম্বরকে উদ্ধার করে উপজেলা সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠান। সেখানে আহত ভাইবোনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়।
কিছুটা ধাতস্থ হয়ে আহত বিলকিছ বেগম সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)’র মোগলাবাজার থানায় ওইদিনই একটি অভিযোগ পেশ করেন। থানার ওসি অভিযোগটি গ্রহণ করে তদন্ত করার জন্য এসআই জিতেনকে দায়িত্ব দেন। আর বাদী বিলকিছকে বলেন, তদন্ত শেষে আপনার অভিযোগ রেকর্ড করা হবে। দায়িত্ব পেয়ে এসআই জিতেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে সরেজমিন তদন্ত করতে গেলে বিবাদীরা পুলিশের উপস্থিতি দেখেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা বাদী বিলকিছ বেগম এবং তার ছোট ভাই মিম্বর আলীকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। শুধু তাই নয়, পুলিশকে সামনে রেখে আবারও বাদী ও তার ছোট ভাইকে মারতে উদ্যত হয়। প্রাণের ভয়ে বাদীপক্ষ পুলিশের সহযোগিতা চাইলে এসআই জিতেন বাদীপক্ষকে নিজের ঘরের ভেতরে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। অথচ মাদকসেবী হামলাকারীদের কিছু বলেননি। এরপর থেকে রহস্যজনক কারণে বিলকিছ বেগমের পেশকৃত অভিযোগটি একই অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোন অগ্রগতি হচ্ছে না। গত ১৮ মে সন্ধ্যায় বিলকিছ বেগম ছোট ভাই মিম্বর আলীসহ ২/৩ জন আত্মীয় নিয়ে এসএমপি’র মোগলাবাজার থানায় গেলে ওসির অনুপস্থিতিতে কথিত সেকেন্ড অফিসার এসআই মোশাররফ বাদীকে শান্তনা দিয়ে বলেন, এই মুহুর্তে এসআই জিতেন বাইরে আছেন। তিনি আসার সাথে সাথেই আপনার অভিযোগটি রেকর্ড করা হবে। কিন্তু কার্যত এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিলকিছ বেগমের বিচারের বাণী নিরবে কাঁদছে।
এদিকে, একইভাবে গত ১৮ এপ্রিল বিলকিছ বেগমের ছোট ভাই মিম্বর আলী তার পৈতৃক মৌরশী ভূমিতে ঘর তুলতে গেলে ইছবর-আকবর চক্রসহ অন্যরা তাকে বাঁধা দেয়। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে উচ্চবাচ্য শুরু হলে পরিস্থিতি ক্রমশঃ উত্তপ্ত হতে থাকে। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিষয়টি নিস্পত্তি করতে এগিয়ে আসেন। তারা সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি নিস্পত্তির উদ্যোগ নিয়ে বেশ কয়েকদিন চেষ্টা চালালেও শুধুমাত্র ইছবর-আকবর চক্রের গোয়ার্তুমির কারণে শেষপর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়। পরে স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের মুরব্বিগণ মিম্বর আলীকে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। এর পরিপ্রেক্ষিতে মিম্বর আলী গত ২৭ এপ্রিল এসএমপি’র মোগলাবাজার থানায় একটি জিডি এন্ট্রি করেন (জিডি নং-১৩৩৮/২৬)। এই জিডি বর্তমানে তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে।
ভূক্তভোগী বিলকিছ বেগম ও মিম্বর আলী জানিয়েছেন, ইছবর-আকবর চক্র এ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে ৫টি মামলা করেছেন। যা এখনও তদন্তাধীন ও চলমান রয়েছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী সুত্রে জানা গেছে, ইছবর আলী একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। নিজেও বিভিন্ন রকমের মাদক সেবন করেন। পাশাপাশি মাদক সরবরাহ করে তিনি এলাকার তরুণ ও যুব সমাজকে বিপথগামী করছেন। এ নিয়ে নিজেদের সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তায় স্থানীয় অভিভাবকরাও শংকিত। কিন্তু কেউ প্রতিবাদী হলেই তাকে ইছবর-আকবর চক্রের রোষানলে পড়তে হয়। এ ভয়ে কেউ প্রতিবাদী হতে সাহস পাচ্ছে না। মাদকের ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসনেরও তেমন নজরদারী আছে বলে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।
Leave a Reply