ছয়ফুল আলম পারুল: মানুষ অদ্ভুত এক সত্তা—সে স্বপ্ন দেখে, সংগ্রাম করে, জমায়, গড়ে তোলে; অথচ শেষ পর্যন্ত তাকে হারিয়ে যেতে হয় সময়ের বিশাল স্রোতে। আজ যে ঘরে আমরা বাস করছি, যে জমি আমাদের নামে, যে সম্পদকে আমরা নিজের বলে ভাবছি—দুই শতাব্দী পর সেসবের মালিকানা থাকবে অন্য কারও হাতে। তারা আমাদের চিনবে না, আমাদের অস্তিত্ব তাদের কাছে অচেনা এক ইতিহাস হয়ে থাকবে।
আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো—ভুলে যাওয়া। আমরা যেমন আমাদের পূর্বপুরুষদের অধিকাংশের কবরের অবস্থান জানি না, তাদের জীবনসংগ্রামও জানি না; ঠিক তেমনি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও একসময় আমাদের ভুলে যাবে। হয়তো আমাদের সন্তানরা কিছুদিন স্মরণ করবে, মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্মৃতিও ম্লান হয়ে যাবে। একসময় এমন দিন আসবে, যখন আমাদের নামটিও আর উচ্চারিত হবে না।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—তাহলে আমরা কীসের জন্য এত দৌড়ঝাঁপ করছি?
মানুষ আজ সম্পদের পেছনে ছুটছে—কখনো বৈধ পথে, কখনো অবৈধভাবে। কেউ সুদে, কেউ ঘুষে, কেউ অন্যের অধিকার হরণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে। কিন্তু সেই সম্পদ কি তার সাথে কবরে যাবে? না, যাবে না। বরং সেই সম্পদই একদিন অন্যের হাতে যাবে, আর তার নাম হারিয়ে যাবে বিস্মৃতির অতলে।
অন্যের সম্পত্তি দখল করে, অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন করে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যদি কেউ নিজেকে সফল মনে করে—তবে সে আসলে নিজেকেই প্রতারিত করছে। কারণ, এই সাফল্য সাময়িক; এর কোনো স্থায়িত্ব নেই। মৃত্যুর পর এই অর্জনের কোনো মূল্য থাকে না।
বরং মানুষের প্রকৃত সম্পদ হলো তার সৎকর্ম, তার নৈতিকতা, তার মানবিকতা। এই গুণগুলোই মানুষকে মৃত্যুর পরও বাঁচিয়ে রাখে—মানুষের দোয়ায়, স্মৃতিতে, শ্রদ্ধায়। একটি ভালো কাজ, একটি সৎ আচরণ, একটি সহানুভূতির হাত—এসবই চিরস্থায়ী বিনিয়োগ।
আমাদের সময় খুব সীমিত। এই অল্প সময়ের মধ্যে যদি আমরা অন্যায়, দুর্নীতি, লোভ আর ক্ষমতার অহংকারে ডুবে থাকি—তবে আমরা আমাদের প্রকৃত লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। জীবন শুধু ভোগের জন্য নয়; এটি প্রস্তুতিরও একটি সময়—একটি চিরস্থায়ী জীবনের জন্য প্রস্তুতি।
তাই এখনই সময় নিজেকে প্রশ্ন করার—আমি কী রেখে যেতে চাই? কিছু জমি-জমা, নাকি কিছু সৎকর্ম? মানুষ আমাকে কীভাবে স্মরণ করবে—একজন লোভী হিসেবে, নাকি একজন সৎ মানুষ হিসেবে?
চলুন, আমরা নিজেদের পরিবর্তন করি। অন্যায় থেকে সরে আসি, ন্যায়কে আঁকড়ে ধরি, মানুষের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করি। কারণ, এই পৃথিবীর সবকিছু ফেলে একদিন চলে যেতে হবে। তখন সঙ্গে থাকবে না কোনো সম্পদ, থাকবে শুধু আমাদের কর্ম।
আর সেটিই হবে আমাদের প্রকৃত পরিচয়, প্রকৃত সম্পদ।
Leave a Reply